পুণ্যের প্রতি ভালবাসা এবং পাপের সাথে শত্রুতার নাম হচ্ছে ঈমান
“পুণ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং পাপের প্রতি শত্রুতা”—এই চেতনাই ঈমান।
অর্থাৎ, ঈমান হলো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের এমন এক জীবন্ত প্রকাশ, যা মানুষকে নেক কাজ ভালোবাসতে এবং গুনাহ থেকে ঘৃণা করতে শেখায়। ঈমান শুধু মুখে বিশ্বাসের স্বীকারোক্তি নয়; বরং অন্তরের দৃঢ় প্রত্যয়, যা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে পরিচালিত করে। হৃদয়ের এই অনুভূতি যখন কথা ও কাজে প্রতিফলিত হয়, তখনই ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করে। ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—পুণ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং পাপের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন; আর কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়।” (সূরা আল-হুজুরাত: ৭)
প্রকৃত ঈমানদারের হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবেই নেক কাজের প্রতি আকর্ষণ এবং গুনাহের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়। এটি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত।
হাদিসে
রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈমানের স্বরূপ আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সব কিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, ঈমান তার অন্তরে
প্রবেশ করেছে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসা মানেই তাঁদের আদেশ মানা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা। ফলে পাপ কাজ ঈমানদারের কাছে ঘৃণিত হয়ে ওঠে।
আরেক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন: “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; যদি না পারে, তবে মুখে প্রতিবাদ করে; আর তাও যদি না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করে—আর এটিই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।” (সহিহ মুসলিম)
ঈমান মানুষকে নৈতিকভাবে সংবেদনশীল করে তোলে। একজন মুমিন নেক কাজ করতে আনন্দ অনুভব করে—নামাজ, রোজা, সদকা, সত্যবাদিতা ও ইনসাফ তার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মিথ্যা, জুলুম, ব্যভিচার, সুদ, অন্যায় ও অশ্লীলতা তার কাছে অগ্রহণযোগ্য ও ঘৃণিত হয়।
রাসুল ﷺ আরও বলেন: “পাপ হলো সেটাই, যা তোমার অন্তরে খচখচ সৃষ্টি করে এবং তুমি চাও না মানুষ তা জানুক।” (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস প্রমাণ করে, ঈমানদারের হৃদয় জীবন্ত থাকে এবং পাপ তাকে মানসিক অস্বস্তিতে ফেলে।
সুতরাং, ঈমান কোনো স্থির বিষয় নয়; বরং তা বাড়ে ও কমে। নেক কাজ ঈমান বাড়ায় এবং পাপ ঈমান দুর্বল করে। এজন্য একজন মুমিন সবসময় চেষ্টা করেন নেক কাজকে ভালোবাসতে ও গুনাহ থেকে দূরে থাকতে।
পরিশেষে বলা যায়, পুণ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং পাপের প্রতি শত্রুতা—এই চেতনাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। যে হৃদয়ে এই চেতনা জাগ্রত থাকে, সে হৃদয় আল্লাহর নূরে আলোকিত হয়। আর এই ঈমানই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার পথে পরিচালিত করে।
১️⃣ ঈমানকে ভালোবাসা ও পাপকে অপছন্দ করা
আরবি:
وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ ٱلْإِيمَـٰنَ وَزَيَّنَهُۥ فِى قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ ٱلْكُفْرَ وَٱلْفُسُوقَ وَٱلْعِصْيَانَ ۚ
বাংলা অর্থ: কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুসজ্জিত করেছেন; আর কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের কাছে ঘৃণিত। 📖 সূরা আল-হুজুরাত: ৭
২️⃣ পাপ ও নেকির পার্থক্য করা আরবি:
قُل لَّا يَسْتَوِى ٱلْخَبِيثُ وَٱلطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ ٱلْخَبِيثِ ۚ বাংলা অর্থ: বলুন, অপবিত্র ও পবিত্র কখনো সমান হতে পারে না, যদিও অপবিত্রের প্রাচুর্য তোমাকে বিস্মিত করে। 📖 সূরা আল-মায়িদা: ১০০
৩️⃣ নেক কাজ ভালোবাসা ও
অশ্লীলতা ঘৃণা করা আরবি:
إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُ بِٱلْعَدْلِ وَٱلْإِحْسَـٰنِ وَإِيتَآئِ ذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ ٱلْفَحْشَآءِ وَٱلْمُنك ۚ বাংলা
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দানের
নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও জুলুম থেকে নিষেধ করেন। 📖 সূরা আন-নাহল: ৯০
এই পবিত্র আয়াতে (সূরা বাকারাহ: ১৭৭) খাঁটি বিশ্বাস এবং সরল সঠিক পথের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। হযরত আবূ যার (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, 'ঈমান কি জিনিস?' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন। তিনি পুনরায় এই আয়াতটি পাঠ করেন। তিনি আবার প্রশ্ন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'পুণ্যের প্রতি ভালবাসা এবং পাপের সাথে শত্রুতার নাম হচ্ছে ঈমান (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কিন্তু এই বর্ণনাটির সনদ মুনকাতা'।
এক ব্যক্তি হযরত আবূ যার (রাঃ) কে প্রশ্ন করেঃ 'ঈমান কি?' তখন তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। লোকটি বলেঃ 'জনাব! আমি আপনাকে মঙ্গল সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করিনি, বরং আমার প্রশ্ন ঈমান সম্বন্ধে।' হযরত আবূ যার (রাঃ) তখন বলেনঃ 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ প্রশ্নই করেছিল। তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন, ঐ লোকটিও তখন তোমার মতই অসন্তুষ্ট হয়েছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ মু'মিন যখন সৎ কাজ করে তখন তার প্রাণ খুশি হয় এবং সে পুণ্যের আশা করে আর যখন পাপ করে তখন তার অন্তর চিন্তিত হয় এবং সে শাস্তিকে ভয় করতে থাকে (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)।
